ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনবিষয়ক পোস্ট মডারেশনের ক্ষেত্রে ফেইসবুক পক্ষপাতিত্ব করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীন তদন্তের পরামর্শ দিয়েছে শীর্ষ সামাজিক মাধ্যমটির ওভারসাইট বোর্ড।

ফেইসবুক ফিলিস্তিনের অধিকারকর্মীদের পোস্টে কাঁচি চালায়–এমন অভিযোগ উঠার পর এই প্রসঙ্গে ফেইসবুক সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে ব্যর্থ হওয়ার ফলেই স্বাধীন তদন্তের পরামর্শ দিয়েছে বলে জানিয়েছে ওভারসাইট বোর্ড।

চলতি বছরের মে মাসে মিশরের এক ফেইসবুক ব্যবহারকারী আল-জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্কের নিউজ পেইজ থেকে গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও সহিংসতা নিয়ে প্রকাশিত একটি খবর শেয়ার করেছিলেন। ওই পোস্টের সূ্ত্র ধরেই ফেইসবুকের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

ওভারসাইট বোর্ডের সিদ্ধান্তকে “স্বাগত” জানিয়ে তাদের পরামর্শগুলো বিবেচনা করে দেখার কথা বলেছে ফেইসবুক।

“বোর্ডের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি তাদের সবগুলো পরামর্শ বিবেচনা করে আমরা এই পোস্টটি আপডেট করবো”– জবাব দিয়েছে ফেইসবুক।

ওই পোস্টে সামরিক পোশাকে মুখ ঢাকা দু’জন ব্যক্তির ছবি ছিলো। ওই দুই ব্যক্তির মাথায় ছিলো ইজ্জেদ্বীন আল-কাসাম ব্রিগেডের চিহ্নবাহী হেডব্যান্ড। হামাসের সামরিক অঙ্গসংগঠন এই ব্রিগেড।

ওই পোস্টের আরবি লেখা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে ফেইসবুকের ওভারসাইট বোর্ড–“আল আকসা মসজিদ এবং শেখ জাররাহ এলাকা থেকে সৈনিকদের ফিরিয়ে নিতে দখলদারদের ছয়টা পর্যন্ত সময় দিচ্ছে প্রতিরোধকারী নেতৃত্ব। আবু উবাইদা- আল-কাসাম ব্রিগেডের সামরিক মুখপাত্র।”

মূল পোস্টের সঙ্গে কেবল আরবিতে ‘ওহ’ লিখে শেয়ার দিয়েছিলেন মিশরের ব্যবহারকারী। পোস্টটি প্রথমে মুছে দিয়েছিলো ফেইসবুক। পরে ওই ব্যবহারকারী সরাসরি ওভারসাইট বোর্ডের কাছে অভিযোগ তুললে পোস্টটি আবার ফিরিয়ে আনে প্রতিষ্ঠানটি।

উল্লেখ্য, ফেইসবুকের নিজস্ব নীতিমালায় আল-কাসামকে বিপজ্জনক গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে।

পোস্ট যাচাই বাছাইয়ের দায়িত্বে থাকা দুইজন মানুষ কীভাবে একযোগে ওই পোস্টটিকে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি ফেইসবুক। কোনো পোস্ট মুছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার কারণ দাপ্তরিক নথিতে লিপিবদ্ধ করার কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই ফেইসবুক মডারেটরদের।

ছবি: রয়টার্সছবি: রয়টার্সপরবর্তীতে, “নির্ভরযোগ্য একটি সংবাদমাধ্যম থেকে প্রকাশিত জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ খবর পুনঃপ্রকাশনার কারণে” পোস্টটি আগের জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ওভারসাইট বোর্ড।

বিবিসি জানিয়েছে, তদন্তের অংশ হিসেবে, এপ্রিল ও মে মাসে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি সহিংসতা চলাকালীন দখলদার দেশটির সরকারের কাছে থেকে ফেইসবুক ওই বিষয়ের পোস্ট মুছে দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক অনুরোধ পেয়েছিলো কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছিলো ওভারসাইট বোর্ড।

ফেইসবুক ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কোনো “আনুষ্ঠানিক অনুরোধ” পায়নি বলে জানালেও, “অনানুষ্ঠানিক অনুরোধে”-এর ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি প্রতিষ্ঠানটি।

ওভারসাইট বোর্ডের তদন্ত শুরু হওয়ার পর ফেইসবুকের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন ব্যবহারকারীদের অনেকে। বলা হচ্ছে, ইসরায়েলি দখলদারদের সহিংসতা চলাকালীন ফিলিস্তিনের নাগরিকদের আরবি ভাষার পোস্ট মুছে দিচ্ছিলো ফেইসবুক।

ফিলিস্তিনভিত্তিক ডিজিটাল অধিকারবিষয়ক একটি সংস্থা জানিয়েছে, ৬ মে থেকে ১৯ মে পর্যন্ত সহিংসতা চলাকালীন ফেইসবুক পাঁচশ’র বেশি পোস্ট মুছে দিয়েছে।

পরবর্তীতে কিছু পোস্ট ‘ভুলভাবে’ চিহ্নিত করার দায় স্বীকার করে ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ স্টাইয়াহ’র কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন ফেইসবুকের বৈশ্বির সম্পর্ক বিষয়ক ভাইস-প্রেসিডেন্ট নিক ক্লেগ।

তদন্ত শেষে ফেইসবুককে ওভারসাইট বোর্ড যে পরামর্শগুলো দিয়েছে সেগুলো হলো:

ইসরায়েল বা ফিলিস্তিন, কোনো পক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন একটি স্বাধীন সত্তা তৈরি করতে হবে যা আরবি ও হিব্রু ভাষার কন্টেন্ট মডারেশন এবং অটোমেশন পক্ষপাতমুক্ত কি না, সেই বিষয়টি নিয়ে চুলচেড়া বিশ্লেষণ করবে।

তদন্তের ফলাফল জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।

ফেইসবুক সব দেশের সরকারের কাছ থেকে কন্টেন্ট মুছে দেওয়ার জন্য কীভাবে অনুরোধ পায় এবং তাতে কীভাবে সাড়া দেয়, সেই প্রক্রিয়ার একটি বাহ্যিক কাঠামো তৈরি করে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য স্বচ্ছতা প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশ করতে হবে।

যে সরকারি অনুরোধগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং যেগুলো নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি– তদন্ত প্রতিবেদনে তার মধ্যকার পার্থক্য পরিস্কার থাকতে হবে।