১৯৯৩ সালের কথা। আমি তখন কম্বোডিয়ায় জাতিসংঘ মিশনে কর্মরত। সময়টা এপ্রিলের শেষ। এক মাস পরই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে দেশটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সাধারণ নির্বাচন। জনমত যাচাই এবং জন-ধারণা ইঙ্গিত দিচ্ছে হুন সেনের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন কম্বোডিয়ান পিপলস পার্টি (সিপিপি) এবং প্রিন্স নরোদম রানারিধের নেতৃত্বাধীন ফুনসিনপেক পার্টির হাড্ডা-হাড্ডি লড়াইয়ের। স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিক সমাজ দুই দলের নেতাদের সাক্ষাৎকার আর বক্তব্য বের করা নিয়ে ব্যস্ত।

এরই ধারাবাহিকতায় একদিন নমপেন পোস্ট পত্রিকার এক জাঁদরেল সাংবাদিক ধরে বসলেন হুন সেনকে। সাক্ষাৎকারের শুরুতেই ছুঁড়ে দিলেন এক আক্রমণাত্মক প্রশ্ন, যার মর্মার্থ ছিল এমন- আপনার দল অনেকদিন ধরেই ক্ষমতায়। আপনার দল এবং দলের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অসংখ্য দুর্নীতির অভিযোগ। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

প্রায় অন্ধ এক চোখ নিয়েই ঠোঁটে স্মিত হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে হুন সেন জবাব দিলেন, ‘দেখুন, দীর্ঘদিনের সিভিল ওয়ারে ক্ষতবিক্ষত একটা দেশের প্রশাসনে দুর্নীতি নেই, এ কথা যদি বলি, তাহলে মিথ্যে বলা হবে। আমার সরকারে দুর্নীতি ছিল এবং আছে, এ কথা আমি অস্বীকার করব না। কিন্তু গত কয়েক বছরে আমি বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করতে। সর্বাংশে সফল হয়ত হতে পারিনি, কিন্তু আমার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে আমার এই প্রয়াসকে আরও গতিশীল করব, এই প্রতিশ্রুতি আমি দিতে পারি।’

এর পরেরটুকু ইতিহাস। নির্বাচনে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট। ধীরে ধীরে হুন সেনের সর্বময় ক্ষমতা দখল। আমি ইতিহাসের সেই দিকে যাব না। আমার আলোচনা সীমিত রাখতে চাই তার সাক্ষাৎকারেই। পাঠক, লক্ষ্য করুন, হুন সেন একবারের জন্যও দাবি করেননি যে তার দল বা সরকারে দুর্নীতি নেই। বরং বাস্তবতাকে অবলীলায় স্বীকার করে নিয়ে তার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। কিন্তু আমাদের দেশের ক্ষেত্রে কী দেখি? আমরা সবসময়ই একজন দুর্নীতিবাজ ‘নন্দ ঘোষ’-কে খুঁজি, যার ঘাড়ে সব বোঝা চাপিয়ে দিয়ে নিজে ভারমুক্ত থাকতে পারি। গত ৩০ বছরে আমরা দেখেছি বেশ কয়েকবারই আমাদের দেশ দুর্নীতির বৈশ্বিক মানদণ্ডে কখনও চ্যাম্পিয়ন কখনও রানার-আপ হয়েছে এবং প্রতিবারই আমরা একজন ‘নন্দ ঘোষে’র ঘাড়ে দায় চাপানোর চেষ্টা করেছি। যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, তারা বলতো এসবের পেছনে আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী সমর্থক মিডিয়ার হাত আছে। আওয়ামী আমলেও এর কোনো পরিবর্তন দেখছি না। জনস্বার্থবিরোধী যাই ঘটুক না কেন, সরকার সবসময়ই খুঁজে বেড়ায় বিএনপি-জামায়াতের ষড়যন্ত্র, একজন অদৃশ্য ‘নন্দ ঘোষ’। মনে পড়ে, প্রায় এক দশক আগে এ দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যাংক দুর্নীতির বিষয়টি যখন প্রকাশ পেল, আমাদের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এত বড় বাজেটের দেশে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা কিছুই না।’ কিছুদিন পর অবশ্য তিনিই বলেছিলেন, ‘আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরে যা হচ্ছে, তা পুকুর চুরি নয়, সাগর চুরি’। এরপর কত সময় চলে গেছে, দুর্নীতির পাগলা ঘোড়া তার মতো করেই ছুটে চলেছে। কখনও রাজনীতিবিদ, কখনও ঠিকাদার, কখনও আমলা, কত নামই এসেছে দুর্নীতি-ঘোড়ার সহিস হিসেবে। কিন্তু যথাযথ দায় নিরূপণ কখনও হয়নি, বরং প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুর্নীতির হোতার ঠিকুজী খুঁজে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি তার পিতা-পিতামহের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা তার ছাত্রজীবনে কোনো বিশেষ দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা।

দেশের এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি তার দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় সাম্প্রতিক সময়ের বহুল আলোচিত ‘মুজিববর্ষের উপহারের ঘর’ ভেঙে পড়ার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, কিছু মানুষ হাতুড়ি-শাবল দিয়ে ঘরগুলো ভেঙে তা গণমাধ্যমে প্রচার করেছে। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, সেই সব ব্যক্তিদের নামের তালিকাও তার হাতে আছে। অভিযোগটি নিঃসন্দেহে গুরুতর, বিশেষ করে একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন নিজেই তা উত্থাপন করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেড় লাখ ঘরের মধ্যে মাত্র ৩০০টি ঘরের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে। তিনি এ কথাও বলেছেন যে, ৩০০ ঘরের মধ্যে কিছু কিছু ঘর প্রবল বৃষ্টির ফলে মাটিধসে নষ্ট হয়ে গেছে। আর মাত্র ৯টি ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাহলে দুর্নীতির অভিযোগ একেবারে মিথ্যা নয়। ৯টি নয়, ১টি ক্ষেত্রেও যদি দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাকে অবহেলার কোনো কারণ নেই। আর এই যে মাটি ধসে যাওয়ার বিষয়টি? প্রশ্ন থেকেই যায়, যেখানে মাটি ধসে যাওয়ার সম্ভাবনা বা আশংকা আছে, সেখানে যথাযথ প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে ঘর নির্মাণ করা হলো কেন? স্পষ্টতই এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতি আছে। কারও গাফিলতির দায়ভার জনগণ বহন করবে কেন? এ সংক্রান্ত গত কয়েক মাসের পত্র-পত্রিকার খবর বিশ্লেষণ করলে যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য।

গত ১৪ জুলাই প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক খবর মতে, সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার তৈলকুপি গ্রামের ১৩টি ঘরের মধ্যে ৭টিরই দুই পাশে ছিল গভীর ডোবা, যে কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই ডোবার পাড় ভেঙে ঘরগুলো ধসে পড়েছে। প্রশ্ন হলো, এমন জায়গায় ঘর তৈরি করা হলো কোন যুক্তিতে? সরকারের তথা জনগণের টাকা এভাবে অপচয় করার কি কোনো দায় নেই? শরিয়তপুরের গোসাইরহাটের ২২টি ঘরের মধ্যে ১৬টিই ধসে পড়েছে ভুল জায়গা নির্বাচনের জন্য। এ কথা সেখানকার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নিজেই স্বীকার করেছেন (যুগান্তর, ৮ জুলাই)। এরকম ভুল সিদ্ধান্তের মাসুল কেন জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় পূরণ করা হবে? পত্রিকায় শুধু ঘর নির্মাণ নয়, ঘর বরাদ্দের বিষয়েও বহু অভিযোগ উঠে এসেছে। এক খবর মতে, বরগুনার আমতলীতে একটি ঘর বরাদ্দের জন্য পরিবার প্রতি ৩০ থেকে ৪০ হাজার পর্যন্ত টাকা দিতে হয়েছে। ফরিদপুর সদরে দিতে হয়েছে ২৫ হাজার টাকা (প্রথম আলো, ১৪ জুলাই)। বাউফলে আরও ভয়ংকর অবস্থা। রহিমা বেগম নামে একজনের কাছে ঘরের মেঝে পাকাকরণ এবং মিস্ত্রিদের খাওয়া খরচ বাবদ মোট ৮৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে (যুগান্তর, ২ জুলাই)। এখানে মাত্র তিন-চারটি জেলার কথা উঠে এসেছে, তবে সারাদেশেই এমন কথা শোনা যাচ্ছে। বিষয়গুলোর তদন্ত ও অনুসন্ধান না হলে দুর্নীতিবাজরাই কি উৎসাহ পেয়ে যাবে না?

জনগণ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে দুর্নীতির বিষয়ে কঠিন কথা শুনতে চায়, অদৃশ্য ‘নন্দ ঘোষ’র হাতে হাতুড়ি-শাবলের কাহিনী শুনতে চায় না। হয়ত এতে তার দলের কেউ কেউ, কিংবা আমলা সম্প্রদায়ের কেউ কেউ নাখোশ হবেন। কিন্তু দিন শেষে জনগণ খুশী হবে। মঙ্গল হবে দেশের।

মোশতাক আহমেদ: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা, পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার, আফগানিস্তান