মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। এর পরও নিম্নমানের বিটুমিন খালাসে নানা ফন্দি আঁটছিল চট্টগ্রামের দুই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীর অ্যান্ড আদারস ও হাসান কনস্ট্রাকশন। সরকার নির্ধারিত তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে মান পরীক্ষার ফল ‘নেগেটিভ’ আসার পরও আমদানি করা বিটুমিনের বিশাল চালান খালাস করতে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করে প্রতিষ্ঠান দুটি। গত সোমবার তাদের আবেদন খারিজ করে দেন আদালত। ফলে নিম্নমানের বিটুমিন জালিয়াতি করে ছাড়িয়ে নেওয়ার সব রকম অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।

সূত্র জানায়, দুটি প্রতিষ্ঠানের ২৬২ কনটেইনার বিটুমিন বহনকারী একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের ৯ নম্বর জেটিতে নোঙর করে রাখা হয়েছে। বিটুমিন খালাসের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রথমে তারা ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে মান পরীক্ষা করে। ওই পরীক্ষায় দেখা যায়, আমদানি করা এসব বিটুমিনের মান সরকার নির্ধারিত কাঙ্ক্ষিত মান পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। এ অবস্থায় বিটুমিন ছাড়িয়ে নিতে উচ্চ আদালতে যায় তারা।

এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সমরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, আমদানি করা বিটুমিন খালাস হওয়ার আগে মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। সরকার-নির্ধারিত মানের সঙ্গে অসংগতি দেখা দিলে এসব বিটুমিন খালাসের সুযোগ নেই। জাহাঙ্গীর অ্যান্ড আদার্স ও হাসান কনস্ট্রাকশনের আমদানি করা বিটুমিন সরকার নির্ধারিত কাঙ্ক্ষিত মান পূরণ করতে ব্যর্থ।

তিনি আরো বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত মান প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ার পরও বিটুমিনের চালানটি খালাস করতে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছিল জাহাঙ্গীর অ্যান্ড আদার্স। সোমবার আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেন।

কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইরান থেকে আনা নিম্নমানের বিটুমিন খালাসে মরিয়া হয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠান দুটি। ইস্টার্ন রিফাইনারির পরীক্ষায় ফল নেগেটিভ আসা সত্ত্বেও বিটুমিনের এই বিশাল চালান ছাড়িয়ে নিতে নানা অপতৎপরতা চালায় তারা। রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে প্রভাব খাটানোরও চেষ্টা করে। সব শেষ এসব বিটুমিন ছাড় করার জন্য ভিন্ন কৌশল হিসেবে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির পরীক্ষার ফল প্রত্যাখ্যান করে নিম্নমানের বিটুমিনের চালান খালাসের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। খোদ ইস্টার্ন রিফাইনারির কর্মকর্তারাও এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের অভিযোগ তুলেছেন। প্রতিষ্ঠানটির কোয়ালিটি কন্ট্রোলের প্রধান জাহেদুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারির মান পরীক্ষার যন্ত্রটি সম্পূর্ণ অটোমেটিক এবং সবচেয়ে আধুনিক। বিটুমিন পরীক্ষার কাজটি সেখানেই হয়ে থাকে। যন্ত্রটি এতটাই আধুনিক যে সেখানে ম্যানিপুলেশনের কোনো সুযোগ নেই। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের মান প্রশ্নবিদ্ধ করার বিষয়টি মোটেও প্রতিষ্ঠানের জন্য সম্মানজনক নয়।

এ খাতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিচয় গোপন করে ইরান থেকে আনা বিটুমিন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের লেরেলে ঢুকছে দেশে। মানহীন বিটুমিন আমদানি বন্ধ না হলে দেশের সড়ক নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধই থাকবে।

দেশে নিম্নমানের বিটুমিন আমদানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এত দিন বিটুমিন আমদানি হলেও মান নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা ছিল না। ফলে অহরহ নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি হচ্ছিল; কোনোভাবেই সেটি ঠেকানো যাচ্ছিল না। এতে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে হাজার কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছিল সরকারের। সর্বশেষ গত ২৫ মে বিটুমিনের মান নিশ্চিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তিনটি নির্ধারিত ল্যাবে মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে। এর পর থেকেই মূলত নিম্নমানের বিটুমিন আমদানির চক্রটি বিপাকে পড়ে।