করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সারা পৃথিবী যেখানে স্থবির, সেখানে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বিচার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার মাধ্যমে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রচেষ্টায় ভার্চুয়ালি সচল রাখা গেছে বিচার বিভাগ। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের একাধিক বিচারপতি ও কর্মকর্তা-কর্মচারী, নিম্ন আদালতের বিচারক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ কয়েক শ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হলেও সচল রয়েছে বিচার কার্যক্রম। ভার্চুয়াল আদালত ব্যবস্থা চালুর মধ্য দিয়ে দেশে বিচার বিভাগে উন্মোচিত হয়েছে নতুন দিগন্ত।

kalerkanthoকরোনার প্রকোপের কারণে আদালত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অ্যাডভোকেট জামিউল হক ফয়সালকে চলে যেতে হয় কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামে। সরকার যখন ভার্চুয়াল আদালত ব্যবস্থা চালু করে, সে সময় তাঁকে সুপ্রিম কোর্টে আসতে হযনি, হাওরে গ্রামের বাড়িতে বসেই সুপ্রিম কোর্টে মামলা পরিচালনা করেন এই আইনজীবী। শুধু জামিউল হক ফয়সালই নন, অনেক আইনজীবী গ্রামে বসেই উচ্চ আদালতসহ সংশ্লিষ্ট আদালতে ভার্চুয়ালি মামলা পরিচালনা করার সুযোগ পাচ্ছেন। শুধু গ্রামে বসেই নয়, দেশের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি সিঙ্গাপুরে বসে, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ সুইজারল্যান্ডে বসে, অ্যাডভোকেট মুনসুরুল হক চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে বসেই বাংলাদেশের আদালতে শুনানি করেছেন। আরো অনেক আইনজীবী পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করেও দেশের আদালতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এর সঙ্গে শুনানিতে যু্ক্ত হয়েছেন বিচারপ্রার্থীরাও।

ভার্চুয়াল আদালত ব্যবস্থা নিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক একাধিকবার বলেছেন, কভিড-১৯ রোগের সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে যখন সব কিছুই বন্ধ, তখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে ভার্চুয়াল বিচার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ভার্চুয়ালি আদালত পরিচালনার এই উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। এই ব্যবস্থা দেশের বিচারব্যবস্থায় এক নতুন সংযোজন। এ ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে বিচার বিভাগ ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। জনগণের দোরগড়ায় বিচার পৌঁছে দিতে বিচার বিভাগকে ডিজিটাইজেশন করার ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে গেছে এর মধ্য দিয়ে।

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা সংক্রমণের কারণে যখন চারদিকে শুধুই মৃত্যুর খবর, দুঃসংবাদ, সে সময় আমাদের দেশে সরকার ভার্চুয়াল আদালত ব্যবস্থার জন্য আইন করল। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে সচল রাখা হলো। আর আদালত চালু থাকায় বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ লাঘব করা গেছে।’ তিনি বলেন, ‘গত বছর মার্চেও আমরা যেটা ভাবতে পারিনি, কারো চিন্তায়ও আসেনি, আজ তা বাস্তব। আজ ঢাকায় সুপ্রিম কোর্টে না এসেই একজন আইনজীবী গ্রামে বসে আদালতে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে মামলা চালাতে পারছেন। বিদেশে বসেই বাংলাদেশের আদালতে মামলা পরিচালনা করছেন আইনজীবীরা। বিচারপ্রার্থীরাও তা দেখতে পারছেন, শুনতে পারছেন।’

অ্যাটর্নি জেনারেল আরো বলেন, এই কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল ও ক্রিমিনাল সব ধরনের অনেক মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। এটা বিচার বিভাগের জন্য এক অনন্য ইতিহাস।

সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত বছর মার্চে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর থেকে চলতি বছরের ২৯ জুলাই পর্যন্ত অধস্তন আদালতে ৩২৫ জন বিচারক ও ৬৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে দুজন বিচারক ও আটজন কর্মচারী মৃত্যুবরণ করেছেন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের অন্তত ১০ জন বিচারপতি করোনায় আক্রান্ত হন। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীও আক্রান্ত হয়েছেন। এর পরও বিচারিক কাজ থেমে থাকেনি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে বিচারকাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালের ১১ মে থেকে গত ১০ আগস্ট পর্যন্ত দুই ধাপে শুধু অধস্তন আদালতেই তিন লাখ ১৫ হাজার ৫৫৮টি মামলায় এক লাখ ৬০ হাজার ৭৬৭ জনকে জামিন দেওয়া হয়েছে। জামিন আদেশের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কারাগার থেকে মুক্তিও পেয়েছেন। এর মধ্যে প্রথম দফায় ২০২০ সালের ১১ মে থেকে ওই বছরের ৪ আগস্ট পর্যন্ত ৫৮ কার্যদিবসে ভার্চুয়াল শুনানি নিয়ে এক লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৯টি মামলায় ৭২ হাজার ২২৯ জনকে জামিন দেওয়া হয়েছে। আর দ্বিতীয় দফায় গত ১২ এপ্রিল থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত এক লাখ ৬৮ হাজার ২১৯টি মামলায় ৮৮ হাজার ৫৩৮ জনকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ওই সময়ে দুই হাজার ২৬১ শিশুকেও জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এসব শিশু বন্দিদশা থেকে নিজ বাসায় ফিরে গেলেও তাদের জামিনের ব্যবস্থা কিন্তু তাদের অভিভাবক করেননি। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নির্দেশনায় আপিল বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের শিশুবিষয়ক বিশেষ কমিটি শিশুদের জামিনের পদক্ষেপ নেয়। এরপর শিশু আদালত ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বয়ে তাদের জামিনে মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষার চিন্তা থেকেই বিশেষ কমিটি এসব শিশুর মুক্তির পদক্ষেপ নেয় বলে জানা গেছে। এ কাজে সহযোগিতা করে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। এর বাইরেও নিয়মিত আদালত থেকে কয়েক লাখ মামলায় জামিন হয়েছে, যার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বিচার বিভাগের কাছে নেই।

করোনা সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গত বছর ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে আদালতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ওই দিন থেকেই বন্ধ হয়ে যায় আদালতের কার্যক্রম। ওই বছর দফায় দফায় সাধারণ ছুটির মেয়াদ বাড়ায় সরকার। কিন্তু বিচারপ্রার্থীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে ওই বছরের ২৫ এপ্রিল ফুলকোর্ট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভার্চুয়াল আদালত চালু করতে রাষ্ট্রপতিকে অধ্যাদেশ জারির জন্য অনুরোধ জানিয়ে আবেদন করা হয় সুপ্রিম কোর্ট থেকে। আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই আবেদন পাওয়ার পর রাষ্ট্রপতির নির্দেশনার আলোকে আইন মন্ত্রণালয় ওই বছরের ৯ মে ভার্চুয়াল উপস্থিতিকে সশরীরে উপস্থিতি হিসেবে গণ্য করে আদালতে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০ নামে গেজেট প্রকাশ করে। এই অধ্যাদেশের ক্ষমতাবলে ভার্চুয়াল উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আদালতকে মামলার বিচার, বিচারিক অনুসন্ধান, দরখাস্ত বা আপিল শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক গ্রহণ, আদেশ বা রায় দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়।

এই অধ্যাদেশ জারির পর সুপ্রিম কোর্টের বিচারকাজ পরিচালনার জন্য ভার্চুয়াল ব্যবস্থা হাইকোর্ট রুলসে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ কারণে পরদিন ১০ মে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সভাপতিত্বে ফুলকোর্ট সভা হয়। ওই সভা শেষে ওই দিনই সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের স্বাক্ষরে সব আদালতের জন্য পৃথক পৃথক ‘প্র্যাকটিস নির্দেশনা’ এবং আইনজীবীদের জন্য ‘ভার্চুয়াল কোর্টরুম ম্যানুয়াল’ প্রকাশ করা হয়। ভার্চুয়াল আদালত কিভাবে শুনানি গ্রহণ করবেন, আদেশ বা রায় দেবেন, আইনজীবীরা কোথায় আবেদন বা মামলা দাখিল করবেন, কিভাবে শুনানি করবেন—সে বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা হয়।