সরকারের নগদ সহায়তা ঘরে তুলতে ছলচাতুরীর আশ্রয় নিচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান। দেশের চামড়া খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এপেক্স ও বের বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠান দুটির উৎপাদিত পণ্যের শতভাগ বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে না। তার পরও শতভাগ রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিবছর সরকারের নগদ সহায়তার অর্থ তুলে নিচ্ছে। এ ছাড়া দেশীয় উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে নিজস্ব কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করে পণ্য রপ্তানির কথা থাকলেও সেটিও মানেনি প্রতিষ্ঠান দুটি। সব মিলিয়ে গত চার অর্থবছরে প্রতিষ্ঠান দুটি তুলে নিয়েছে প্রায় ২৫৫ কোটি টাকা। এপেক্স একাই নিয়েছে প্রায় ১৮৬ কোটি টাকা। নগদ সহায়তার ওপর সিভিল অডিট অধিদপ্তরের ২০২১ সালের অডিট ইন্সপেকশন রিপোর্টে (এআইআর) উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।

সম্প্রতি দুটি বেসরকারি ব্যাংকের গুলশান ও কারওয়ান বাজার শাখায় নিরীক্ষাকালে এই অনিয়ম উঠে আসে। ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৯-২০ পর্যন্ত চার অর্থবছরের নগদ সহায়তার ওপর এই নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অভিযুক্তদের কাছ থেকে এই অর্থ আদায় করে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে যেভাবে ব্যবসা পরিচালিত হয় সেই পদ্ধতির মধ্যে একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির আঁচ এখানে স্পষ্ট। আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকরের কারণে এমনটি হয়ে আসছে। এ রকম পরিস্থিতি যাতে চলতে না পারে তার প্রতিবিধান করা দরকার। সেই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাও আবশ্যিক হয়ে পড়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপেক্স ও বে শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধন নিলেও উভয়ই দেশের বাজারে নিজস্ব আউটলেটের মাধ্যমে ব্যবসা করছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান দুটি শতভাগ রপ্তানি করছে না। কিন্তু শতভাগ রপ্তানিকারক হিসেবে সরকারের নগদ সহায়তার প্রায় ২৫৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার ও বিনিয়োগ বোর্ডের নিবন্ধনের শর্ত ভেঙে এই সহায়তা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এপেক্স চার অর্থবছরে নিয়েছে ১৮৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা। আর বে শুধু ২০১৯-২০ অর্থবছরে নিয়েছে ৬৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। তবে এপেক্স ও বে ফুটওয়্যারের দাবি, শতভাগ রপ্তানির শর্ত পরিপালন করেই সরকারের নগদ সহায়তার অর্থ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বড় বড় প্রতিষ্ঠানও যদি এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে কোনো ধরনের সুশাসন বা নৈতিকতা নেই সেটি প্রমাণ করে।

জানা যায়, বর্তমানে দেশের বাজারে বিক্রির জন্য এপেক্সের প্রায় আড়াই শ এবং বের ৩০টির মতো নিজস্ব আউটলেট রয়েছে। এপেক্স বলছে, রপ্তানি ও দেশের বাজারে বিক্রির জন্য তাদের আলাদা কারখানা রয়েছে, যা ইউনিট-১ ও ইউনিট-২ নামে পরিচিত। এর মধ্যে ইউনিট-১-এ রপ্তানির জুতা তৈরি হয়। অন্যটিতে তৈরি হয় স্থানীয় বাজারের জুতা। দুটির ব্যবস্থাপনাও সম্পূর্ণ আলাদা। বেও জানিয়েছে একই রকমের তথ্য। তবে তাদের কারখানাগুলোর একটি বে ফুটওয়্যারের এবং অন্যটি বে এম্পোরিয়ামের। বে ফুটওয়্যারের অধীন ইউনিট-২, যেটি রপ্তানির জুতা তৈরি করে। আর বে এম্পোরিয়ামের অধীন ইউনিট-১, যেখানে স্থানীয় বাজারের জুতা তৈরি হয়।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, এপেক্স ফুটওয়্যার ইউনিট-১, যেখানে রপ্তানির জুতা তৈরি হয়—এই নামে বিডা থেকে আলাদা কোনো নিবন্ধন নেওয়া হয়নি। আবার এ নামে যৌথ মূলধন কম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের (আরজেএসসি) কার্যালয় থেকে নিবন্ধিত নয় প্রতিষ্ঠানটি। বিডা ও আরজেএসসি থেকে নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড নামে। আবার এপেক্স ফুটওয়্যার ইউনিট-২, যেখানে স্থানীয় বাজারের জুতা তৈরি হয়, সেটির জন্য বিডার নিবন্ধন থাকলেও আরজেএসসির নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এপেক্স ফুটওয়্যার ইউনিট-১ কারখানায় যে রপ্তানির জুতা তৈরি হয়, সেই জুতাও স্থানীয় বাজারে নিজস্ব আউটলেটের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে। আবার স্থানীয় বাজারের জন্য ইউনিট-২ কারখানার তৈরি জুতা দেশের বাইরে আউটলেটের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে। এমন একটি ব্র্যান্ড হলো ভেনচারিনি। এটি ইতালীয় ব্র্যান্ড হিসেবে বাইরে বাজারজাত হয়। ১৯৯০ সালে এপেক্স ফুটওয়্যারের যাত্রার শুরুর পর থেকে এই ব্র্যান্ডের জুতা তৈরি ও রপ্তানি করে আসছে এপেক্স। আর এটি স্মরণীয় করে রাখতে এখনো জুতার গায়ে ‘ভেনচারিনি-১৯৯০, ভেরা পেলে’ নামে ব্র্যান্ডের জুতা তৈরি করছে এপেক্স। এ ছাড়া শুধু ভেনচারিনি নামেও বিভিন্ন মডেলের জুতা তৈরি করা হচ্ছে। এই ব্র্যান্ডের জুতা একবার ভারতেও রপ্তানি করা হয়। স্থানীয় বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের পর থেকে এই ভেনচারিনি ব্র্যান্ডের জুতা নিজস্ব আউটলেটের মাধ্যমেও বিক্রি করা হচ্ছে। এ ছাড়া ম্যাভেরিক, স্প্রিন্টসহ আরো কিছু রপ্তানি ব্র্যান্ডের জুতা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। রাজধানীর বেশ কয়েকটি আউটলেট সরেজমিনে ঘুরে ও এপেক্সের বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া যায়।

বিভিন্ন আউটলেটে দায়িত্বরত কয়েকজন বিক্রয়কর্মী কালের কণ্ঠকে বলেন, রপ্তানি ব্র্যান্ড হওয়ায় ভেনচারিনি জুতায় ইতালীয় নকশা ও ডিজাইন আনার চেষ্টা করা হয়। ফলে এই ব্র্যান্ডের জুতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইউনিট-১ কারখানায় তৈরি করা হয়। আবার মাঝেমধ্যে এই ব্র্যান্ডের জুতা স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্য আমদানিও করা হয়। আমদানি করা জুতার দাম নিজস্ব কারখানায় তৈরি জুতার চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হয়। জুতার গায়ে মূল্য দেখেই বোঝা যায়, সেটি আমদানি করা, নাকি নিজস্ব কারখানায় তৈরি।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, গত বছরের নভেম্বরে এপেক্স ফুটওয়্যার নিজস্ব আউটলেটে ভেনচারিনি উদ্বোধনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করে। ভার্চুয়ালি ওই আউটলেট উদ্বোধন করেন এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। ওই আউটলেটে পাশাপাশি ম্যাভেরিক, স্প্রিন্ট ও নিনো রোসির মতো বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জুতাও স্থান পায়।

রপ্তানির চেয়ে দেশের বাজারে বিক্রি বেশি এপেক্সের : ১৯৯০ সালে ব্যবসা শুরু করা এপেক্স ফুটওয়্যার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ১৯৯৩ সালে। কম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১১ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের এক কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার শেয়ারে বিভক্ত। এপেক্সের নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবদেন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে স্থানীয় বাজারে এপেক্সের জুতা বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৯৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে একই সময়ে জুতা রপ্তানি করে এপেক্সের আয় হয়েছে ৫৮৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, যদিও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের বাজারে বিক্রির চেয়ে বিদেশে রপ্তানির পরিমাণ বেশি ছিল। করোনার কারণে আগেরবারের তুলনায় বিদেশে রপ্তানি এবং দেশের বাজারে বিক্রি দুই-ই কমেছে।

এদিকে বে ফুটওয়্যার ও বে এম্পোরিয়াম বে গ্রুপের সহযোগী দুটি প্রতিষ্ঠান। দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম ভিন্ন হলেও স্থানীয় বাজারে আউটলেটের মাধ্যমে জুতা বিক্রি করছে বে নামে। ফলে বোঝার উপায় নেই যে কোনটি বে এম্পোরিয়াম কারখানার তৈরি জুতা আর কোনটি বে ফুটওয়্যার কারখানার জুতা। যেমন—ইতালীয় ব্র্যান্ড এলিগেন্ট মডেলের জুতা বে আউটলেটে দেদার বিক্রি হচ্ছে। আউটলেটের কেউ বলেছেন, এটি বে গ্রুপের নিজস্ব ব্র্যান্ড, যেটি বে এম্পোরিয়াম কারখানায় তৈরি হয়। আবার কেউ বলেছেন, এটি রপ্তানি ব্র্যান্ডের জুতা, তাই বে ফুটওয়্যারের রপ্তানিসংশ্লিষ্ট কারখানায় তৈরি হয়। আবার কেউ বলেছেন, এটি বে এম্পোরিয়ামের আমদানি করা জুতা। এভাবে গ্রুপটি তার পণ্যের ব্র্যান্ড নিয়ে ছলচাতুরীর আশ্রয় নিচ্ছে।

এপেক্সের বক্তব্য : এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে বক্তব্য চাওয়া হলে তিনি ফিরতি বার্তায় জানান, তিনি ঢাকায় নেই। তিনি সিএজির পর্যবেক্ষণের বিষয়ে জানেন না। তবে এপেক্স ফুটওয়্যার সব নিয়ম-কানুন মেনে রপ্তানি করেই নগদ সহায়তা নিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে যেকোনো সুস্পষ্টভাবে জানতে এপেক্স ফুটওয়্যারের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) দিলীপ কাজুরের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

দিলীপ কাজুরি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা স্বীকার করছি এপেক্স ফুটওয়্যার শতভাগ রপ্তানিমুখী কম্পানি নয়। তবে রপ্তানির সব নিয়ম মেনেই আমরা সরকারের নগদ সহায়তা নিয়েছি।’ তিনি বলেন, এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড নামে যখন বিডা থেকে নিবন্ধন নেওয়া হয়, তখন শুধু এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ব্যবসাই ছিল। এই রপ্তানির জুতা তৈরির জন্য যে কারখানা ব্যবহার করা হয়, সেটি এপেক্স ফুটওয়্যার ইউনিট-১ নামে পরিচিত। ২০১০ সালের দিকে এপেক্স স্থানীয় বাজারে (দেশের অভ্যন্তরে) ব্যবসা শুরু করে। তখন এপেক্স ফুটওয়্যার ইউনিট-২ নামে আরেকটি উইন্ডো খোলা হয়। এটির নিবন্ধনও বিডা থেকে নেওয়া হয়েছে। এই দুটি ইউনিটের ব্যবস্থাপনা, সব হিসাব-নিকাশ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সবই আলাদা। আবার সরকারকেও আলাদাভাবে কর ও ভ্যাট দেওয়া হয়। তিনি বলেন, রপ্তানি ইউনিটে তৈরি হওয়া জুতা স্থানীয় বাজারে বিক্রির সুযোগ নেই। ভেনচারিনি ব্র্যান্ড এপেক্সের নিজস্ব ব্র্যান্ড দাবি করে তিনি বলেন, এই ব্র্যান্ডের জুতা একবার ভারতে রপ্তানি করা হয়েছিল। তবে সেই জুতা রপ্তানি ইউনিটেই তৈরি করা হয়েছিল। তবে স্থানীয় বাজারে ভেনচারিনি ব্র্যান্ড নামে যে জুতা বিক্রি হয়, সেটি স্থানীয় ইউনিটেই তৈরি। নেপালে ভেনচারিনি নামে যে আউটলেট খোলা হয়েছে, সেটি এপেক্স নিজস্ব উদ্যোগে খোলেনি উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘নেপালে আমাদের কোনো বিনিয়োগ নেই, ব্যবসাও নেই। নেপালে জুতা রপ্তানিও করিনি। তবে সে সময় ইনফিনিটি নামের একটি প্রতিষ্ঠান তাদের স্থানীয় কারখানায় তৈরি ভেনচারিনিসহ কয়েকটি ব্র্যান্ডের জুতা কিনে নেপালের আমদানিকারকের কাছে বিক্রি করেছিল। পরে তাদেরই অনুরোধে আমাদের চেয়ারম্যান স্যার ভেনচারিনি নামে ওই আউটলেট উদ্বোধন করেছিলেন।’

বের বক্তব্য : বে গ্রুপের চেয়ারম্যান শামসুর রহমানের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি বিদেশে চিকিৎসাধীন। তাঁর ছেলে বে গ্রুপ ও বে ফুটওয়্যারের এমডি জিয়াউর রহমানও ব্যবসার কাজে বিদেশে আছেন। শামসুর রহমান বে গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক মো. মিজানুর রহমান খানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। এই প্রতিবেদক গ্রুপের অফিসে গেলে মিজানুর রহমান বলেন, ‘অডিট আপত্তি থাকতেই পারে। এটা নিয়ে আমরা কোনো বক্তব্য দিতে চাচ্ছি না। এ বিষয়ে যে সংস্থা থেকে আপত্তি দেওয়া হয়েছে, তাদেরই জবাব দেওয়া হবে।’

দেশে ব্র্যান্ডেড ও নন-ব্র্যান্ড মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক জুতা উৎপাদনকারী কম্পানি ব্যবসা করে। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, দেশের জুতার বাজারের আকার এখন প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার, যা বছরে গড়ে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে।