দেশজুড়ে সংস্কৃতিচর্চা, বিকাশ ও সম্প্রসারণের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। অথচ স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা যায়নি। এখনো জেলা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম। এ অবস্থায় সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের বেশির ভাগ মানুষ। জাতির সাংস্কৃতিক বোধ তৈরি, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনে নেওয়া হচ্ছে না বিশেষ কোনো উদ্যোগ। দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দিতে প্রতিষ্ঠানটি বেশ কটি প্রকল্প হাতে নিলেও সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে না অনুমোদন। ফলে সামাজিক অবক্ষয়, মাদকের ছড়াছড়ি, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও জঙ্গি তৎপরতার বিপরীতে জাতির সাংস্কৃতিক জাগরণের কোনো কার্যক্রমও চোখে পড়ছে না।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টির উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রসারের মাধ্যমে সকল মানুষের জন্য শিল্প-সংস্কৃতির প্রবাহ তৈরি করে শিল্প-সংস্কৃতি ঋদ্ধ সৃজনশীল মানবিক বাংলাদেশ গঠন।’ শিল্পকলা একাডেমির অন্যতম স্লোগান ‘৫৬ হাজার বর্গমাইলে শিল্প-সংস্কৃতির আলো’, ‘১৬ কোটি মানুষের জন্য শিল্প-সংস্কৃতি’ হলেও প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছরেও ৫৬ হাজার বর্গমাইলে ছড়িয়ে দেওয়া যায়নি।

৬৪ জেলায় শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম পরিচালিত হলেও পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধা নেই সব কটি জেলায়। অডিটরিয়ামসহ প্রশিক্ষণ ভবন রয়েছে ৪১টি জেলায়। আর জেলা পর্যায়ে কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে জাতীয় দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠান, শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা প্রদান এবং সংস্কৃতির পাঁচটি বিষয়ে শিশুদের প্রশিক্ষণ।

জেলা পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্থায়ী জনবল রয়েছে মাত্র তিনজন। একজন কালচারাল অফিসার, কম্পিউটার অপারেটর ও একজন অফিস সহকারী। পাঁচটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য স্থানীয়ভাবে নামমাত্র সম্মানী দিয়ে ১০ জন প্রশিক্ষক ও দুজন যন্ত্রশিল্পীকে নিযুক্ত করা হয়। ফলে মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয় না। এ পরিস্থিতিতে শিল্পকলা একাডেমির আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংস্কৃতিসেবীরা।

জেলার বাইরে দেশের ছয়টি উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমি ভবন নির্মিত হয়। এরপর লিয়াকত আলী লাকী শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০১২ সালে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। একটি নীতিমালা তৈরি করে সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের সমন্বয়ে দেশের ৪৯৩টি উপজেলার প্রতিটিতে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। একটি প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিক পর্যায়ে ১০টি উপজেলায় ৫০০ আসনের মুক্তমঞ্চসহ একতলাবিশিষ্ট প্রশিক্ষণ ভবন নির্মাণ করা হয়। পরে ২০১৯ সালের মার্চে ‘১০০ উপজেলায় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ’ প্রকল্প জমা দেওয়া হয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু প্রকল্পটি এখনো অনুমোদন পায়নি। প্রকল্পটির আওতায় ‘জাতীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সমন্বয় রেখে উপজেলা পর্যায়ে মুক্ত মন ও মানসিকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সংস্কৃতির বিভিন্ন মাধ্যম জনগণের কাছে পরিচিত ও জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের উপযোগিতাসহ বহুমুখী ব্যবহারোপযোগী আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত ৪০০ আসনবিশিষ্ট অডিটরিয়াম, উন্মুক্ত মঞ্চ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং লাইব্রেরি নির্মাণ’-এর কথা রয়েছে।

উপজেলা পর্যায়ে শিল্পকলা একাডেমির স্থায়ী লোকবল না থাকায় নিয়মিত কার্যক্রমও নেই। প্রতিটি উপজেলায় একাডেমির কার্যক্রম পরিচালনায় বছরে থোক বরাদ্দ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরাদ্দ দেওয়া এই টাকা উপজেলা প্রশাসনের দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠানেই খরচ হয়ে যায়। জানা যায়, উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন সহকারী সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা ও একজন পিয়ন নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে উপজেলা পর্যায়ে সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণের। এ প্রসঙ্গে জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘দেশে সাংস্কৃতিক জাগরণের জন্য উপজেলা পর্যায়ে সংস্কৃতিচর্চা ও প্রশিক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। সাংস্কৃতিক শিক্ষার জন্য স্থায়ী প্রশিক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছি আমরা। এতে একদিকে শিল্পীদের কর্মসংস্থানের যেমন সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে শিল্পী তৈরি ও শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ তৈরি হবে। এটি করা না গেলে মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকের ছড়াছড়ি, নারী নির্যাতন, জঙ্গি তৎপরতা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না।’

তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ে সরকারি উদ্যোগে মিনি স্টেডিয়াম হচ্ছে, মডেল মসজিদ নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু সংস্কৃতিচর্চার জন্য কিছুই হচ্ছে না। যে গতিতে উপজেলা পর্যায়ে শিল্পকলা একাডেমি হচ্ছে, তাতে এক শতাব্দীতেও সব উপজেলায় তা সম্ভব হবে না।

আবার দেশজুড়ে সংস্কৃতিচর্চা ছড়িয়ে দিতে কিছু প্রকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও তা অনুমোদন পায়নি। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ব্যাপকভিত্তিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে শিল্পকলা একাডেমির একটি পরিকল্পিত প্রকল্প ‘দেশব্যাপী শিশু-কিশোর ও যুব সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও উৎসব’। এর মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসায় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে ক্রমান্বয়ে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। প্রকল্পটি ২০১৬ সালে জমা দেওয়া হলেও এখনো অনুমোদন মেলেনি। এই কার্যক্রমটি গ্রহণ করা গেলে দেশজুড়ে ঘরে ঘরে সংস্কৃতিচর্চার আবহ পৌঁছে দেওয়া যেত।

বিভিন্ন সময়ে শিল্পকলা একাডেমি থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আরো কয়েকটি প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘বাংলাদেশের স্পর্শাতীত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশ’, ‘বাংলাদেশ পুলিশের জন্য সাংস্কৃতিক উৎসব ও কর্মশালা আয়োজন’, পোশাকশিল্পের কর্মীদের সাংস্কৃতিক বিকাশ’ প্রভৃতি। কিন্তু অনুমোদন মেলেনি। এ ছাড়া একাডেমির পক্ষ থেকে শিশু-কিশোর ও যুবদের জন্য সৃজনশীল সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন, শুদ্ধ জাতীয় সংগীত প্রশিক্ষণ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, শিল্পকলা একাডেমি নিয়মিত বার্ষিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সংস্কৃতির বিকাশ ও সম্প্রসারণের জন্য নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছে। কয়েকটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে সরকারের অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে। এগুলো অনুমোদিত হলে দেশজুড়ে সংস্কৃতিচর্চা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।

এদিকে ১৬ বছর ধরে সংশোধনী হচ্ছে না শিল্পকলা একাডেমির প্রবিধানমালা। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও রয়েছে হতাশা। এমন কর্মকর্তাও আছেন, ২৮ বছর ধরে একই পদে কর্মরত থাকলেও পদোন্নতি মিলছে না। এর নেতিবাচক প্রভাবও পড়েছে দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায়।

সংস্কৃতিক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা এবং নতুন প্রকল্প অনুমোদন না হওয়া সম্পর্কে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে গতকাল তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, সংস্কৃতিচর্চার বিকাশের জন্য সরকার অনেক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি নির্মাণ ও নজরুল ইনস্টিটিউট নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এগুলো তো অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প, সংস্কৃতিবোধ তৈরির প্রকল্প তো নেই—এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সংস্কৃতিচর্চা বৃদ্ধির জন্য বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নামে স্মৃতিকেন্দ্র নির্মাণ, জাতীয় চার নেতার নামে স্মৃতিকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৩০টি উপজেলায় সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্যও সমীক্ষা শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।